এটা এখন অনেকেই জানেন যে ভাইরাস সবসময়ই নিজেকে পরিবর্তন করে নতুন রূপ নিতে থাকে – যাকে বলে ‘মিউটেশন’।

কখনো কখনো এই নতুন রূপ নেয়া ভাইরাস আগেরটার চাইতে বেশি ভয়ঙ্কর হয়, বা আগের চাইতে ‘নিরীহ’ও হয়ে যেতে পারে। এমন কিছু মিউটেশনও হতে পারে যার আদৌ কোন প্রভাব পড়ে না।

ভাইরাস কেন এভাবে রূপ পরিবর্তন করে? সাধারণত এর লক্ষ্য হলো – যাতে সে এক মানবদেহ থেকে আরেক দেহে আরো সহজে ছড়াতে এবং বংশবৃদ্ধি করতে পারে, অথবা ওষুধ বা চিকিৎসার মত কোন বাধা মোকাবিলা করে টিকে থাকতে পারে।

করোনাভাইরাসও যে এভাবে মিউটেশনের মাধ্যমে নতুন চেহারা নিতে পারে বা নিচ্ছে – এ ব্যাপারে বিজ্ঞানীরা আগে থেকেই সচেতন ছিলেন।

তবে গত দু’এক দিনে ইংল্যাণ্ডের অন্তত ৬০টি জায়গায় করোনাভাইরাসের এক নতুন ‘স্ট্রেইন’ – এর সন্ধান পাওয়া গেছে।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, সম্প্রতি ওই এলাকায় করোনাভাইরাস সংক্রমণ দ্রুতগতিতে বাড়ার পেছনে এই নতুন রূপগ্রহণকারী ভাইরাসটিই দায়ী।

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থাকে এর মধ্যেই ব্যাপারটি জানানো হয়েছে এবং ব্রিটিশ বিজ্ঞানীরা এই ভাইরাসটি নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা শুরু করেছেন।

এখন প্রশ্ন হলো: এই নতুন ধরণের করোনাভাইরাস কোথা থেকে এলো, এবং আমাদের কতটা উদ্বিগ্ন হবার কারণ আছে।

নতুন প্রজাতির করোনাভাইরাসের আচরণ কি ভিন্ন?

বিবিসির স্বাস্থ্য এবং বিজ্ঞান সংবাদদাতা জেমস গ্যালাহার লিখছেন, করোনাভাইরাসের নতুন স্ট্রেইনের খবর দেখলে প্রথমেই তিনি যে প্রশ্নটি তোলেন তা হলো: ভাইরাসের আচরণে কি কোন পরিবর্তন এসেছে?

ভাইরাসের মিউটেশনের খবর দেখলেই তা আমাদের কাছে একটা ভয়ের খবর বলে মনে হয়। কিন্তু মিউটেশন এবং নিজেকে পরিবর্তন করতে থাকা ভাইরাসের স্বাভাবিক ধর্ম।

অনেক সময় এ পরিবর্তন হয় প্রায় অর্থহীন, কখনো এটা মানুষকে সংক্রমণের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে মরে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।

আবার কখনো কখনো এটা আরো বেশিদিন টিকে থাকার এবং সংক্রমণ বাড়ানোর ‘উইনিং ফরমূলা’ পেয়ে যেতে পারে।

নতুন মিউটেশনটি কি বেশি সংক্রমণের কারণ?

বলা হচ্ছে, ইংল্যান্ডের দক্ষিণ-পশ্চিমে করোনাভাইরাসের এই নতুন মিউটেশনটির সন্ধান পাওয়া গেছে।

তবে এটি যে আগের চাইতে সহজে মানুষ থেকে মানুষে ছড়াতে পারে, গুরুতর অসুস্থতা সৃষ্টি করতে পারে বা ভ্যাকসিনকে মোকাবিলা করতে পারে – এমন কোন সুনির্দিষ্ট প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।

তবে দুটি কারণে বিজ্ঞানীরা এই নতুন ‘স্ট্রেইন’টির ওপর কড়া নজর রাখছেন।

একটি কারণ হলো: যে জায়গাগুলোতে সংক্রমণের সংখ্যা বেশি সেখানেই এই নতুন স্ট্রেইনটি পাওয়া গেছে।

এটি একটি সতর্ক সংকেত। তবে একে ব্যাখ্যা করা সম্ভব দু’ভাবে।

একটি হলো: করোনাভাইরাসের মধ্যে হয়তো এমন একটি মিউটেশন হয়েছে – যা আরো সহজে ছড়াতে পারে, এবং সেকারণেরই সংক্রমণের সংখ্যা বাড়ছে।

নতুন মিউটেশনটি কি স্পেন থেকে এসেছে?

তবে এমনও হতে পারে যে এই নতুন স্ট্রেইনটি “সঠিক সময়ে সঠিক লোকদের” সংক্রমণ করেছিল।

এটাকে বলা হচ্ছে ‘স্প্যানিশ স্ট্রেইন।’ ব্রিটেনের লোকেরা যখন আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসে গ্রীষ্মের ছুটিতে স্পেনে বেড়াতে গিয়েছিল – তখন তারা এই বিশেষ মিউটেশনটিতে সংক্রমিত হয়েছে এবং এটাকে ব্রিটেনে নিয়ে এসেছে।

তবে আসলেই এই স্ট্রেইনটি অন্যগুলোর চাইতে সহজে ছড়াতে পারে কিনা – তা নিশ্চিত হতে হলে ল্যাবরেটরিতে বেশ কিছু পরীক্ষা করে দেখতে হবে।

দ্বিতীয় প্রশ্ন : মিউটেশনটা ঠিক কী ধরণের?

অন্য যে বিষয়টি নিয়ে বিজ্ঞানীদের ভুরু কুঁচকাচ্ছে তা হলো: এ মিউটেশনের ফলে ভাইরাসটিতে যে ধরণের পরিবর্তন এসেছে – সেটা।

কোভিড-১৯ জেনোমিক্স ইউকে (কগ) নামে একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের অধ্যাপক নিক লোম্যান বিবিসিকে বলছেন, “করোনাভাইরাসের ক্ষেত্রে বিস্ময়কর রকমের বেশি সংখ্যায়ং মিউটেশন হয়েছে – আমরা যতটা মনে করেছিলাম তার চেয়ে অনেক বেশি। তবে এর মধ্যে কয়েকটা মিউটেশন আমাদের আগ্রহ সৃষ্টি করেছে।”

বিজ্ঞানীরা বলেছেন, মিউটেশনটা হয়েছে মূলত: দুই ধরণের।

এখন অনেকেই জানেন যে করোনাভাইরাসের গায়ে কাঁটার মতো কিছু ‘স্পাইক’ থাকে এবং তাতে থাকে বিশেষ এক ধরণের প্রোটিন । মানবদেহের কোষের বাধা ভেঙে ভেতরে ঢুকে পড়ার জন্য এই প্রোটিনকে ব্যবহার করে করোনাভাইরাস, এবং তাকে ‘দখল করে’ নেয়।

এই স্পাইকগুলোর সবচেরেয় গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে “রিসেপ্টর বাইন্ডিং ডোমেইন।” ঠিক এই অংশটিকেই পাল্টে দেয় ‘এন ফাইভ জিরো ওয়ান’ নামের মিউটেশনটি।

এই কাঁটার মতো অংশ দিয়েই করোনাভাইরাস প্রথমে মানবদেহের কোষগুলোর সংস্পর্শে আসে। এখানে যদি এমন কোন পরিবর্তন হয় যাতে ভাইরাসটির দেহকোষের ভেতরে ঢোকা সহজ হয়ে যায় – তাহলে বলতেই হবে, এটা এক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন।

অধ্যাপক লোম্যান বলছেন, দেখেশুনে এটাকে একটা গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন বলেই মনে হচ্ছে।

করোনাভাইরাসের অন্য আরেকটি মিউটেশনের নাম ‘এইচ সিক্স নাইন/ভি সেভেন জিরো’। এটি সন্ধান আগেই বেশ কয়েকবার পাওয়া গেছে।

বিশেষ করে নেদারল্যান্ডস ও ডেনমার্কে মিংক নামে এক ধরণের প্রাণীর খামারে (এর লোমশ চামড়া দিযে পোশাক তৈরি হয়) এই মিউটেশনটি পাওয়া গিয়েছিল।

উদ্বেগের বিষয় হলো: সংক্রমণের পর বেঁচে যাওয়া মিংকের রক্তে যে এ্যান্টিবডি পাওয়া যায় – তা ওই মিউটেশনটিকে আক্রমণের ক্ষেত্রে কম কার্যকরী ছিল।

তবে এ ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা ঠিক কী – তা বুঝতে হলে ল্যাবরেটরিতে আরো পরীক্ষা করে দেখতে হবে।

বার্মিংহ্যাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এ্যালান ম্যাকনালি বলছেন, “আমরা জানি যে করোনাভাইরাসের একটা ভিন্ন স্ট্রেইন আছে, কিন্তু জীববৈজ্ঞানিক দিক থেকে এটার মানে কি – তা আমরা এখনো জানি না।”

“এটা গুরুত্বপূর্ণ কিনা বা কতটা – সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত টানার সময়ও এখনো আসেনি।”

কিন্তু এ মিউটেশনের ফলে কি ভ্যাকসিনে আর কাজ হবে?

করোনাভাইরাসের স্পাইক বা কাঁটাগুলোতে যদি মিউটেশন হয় – তাহলে ভ্যাকসিনে আর কাজ হবে কিনা সেই প্রশ্ন উঠছে স্বাভাবিকভাবেই।

কারণ, ফাইজার, মডার্না এবং অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার তৈরি টিকাগুলোর সবগুলোতেই করোনাভাইরাসের স্পাইকটিকে আক্রমণ করার জন্য মানুষের ইমিউন সিস্টেমকে ‘শিখিয়ে দেয়া’ হচ্ছে।

তবে জেমস গ্যালাহার জানাচ্ছেন, টিকা দেবার ফলে মানবদেহ ভাইরাসটির স্পাইকের অনেকগুলো অংশকে আক্রমণ করতে পারে।

সে কারণেই বিশেষজ্ঞরা নিশ্চিত যে করোনাভাইরাসের এই নতুন স্ট্রেইনের বিরুদ্ধেও সমান কার্যকরী হবে এই টিকা।

এই বিশেষ ভাইরাসটি এমন একটি ভাইরাস যা প্রাণীর দেহে বিবর্তিত হয়েছে এবং মানবদেহে সংক্রমণ করতে শুরু করেছে মাত্র বছরখানেক আগে।

তার পর থেকে এটিতে প্রতি দু’মাসে একটি করে মিউটেশন বা পরিবর্তন ঘটছে।

আরও দেখে আস্তে পারেন:সাকিব আল হাসান হারালেন দুই প্রিয়জনকে।

আপনি যদি আজ করোনাভাইরাসের একটি নমুনা নেন, এবং এর সাথে চীনের উহানে প্রথম দিকে পাওয়া ভাইরাসের সাথে তুলনা করেন – তাহলে দেখা যাবে তাদের মধ্যে প্রায় ২৫ দফা পরিবর্তন হয়েছে।

করোনাভাইরাস প্রতিনিয়ত নতুন নতুন মিউটেশন ঘটিয়ে চলেছে – যাতে সে মানুষের দেহে আরো কার্যকরভাবে সংক্রমণ ঘটাতে পারে।

আমরা এর আগেও ব্যাপারটা ঘটতে দেখেছি। এর আগে জি সিক্স ওয়ান ফোর নামে করোনাভাইরাসের আরেকটি প্রকার সম্পর্কে বলা হয়েছিল যে “ভাইরাসটি এখন নিজেকে সহজে ছড়ানোর উপযুক্ত করে নিচ্ছে।”

তবে কিছুদিন পরই যখন গণহারে মানুষকে টিকা দেয়া শুরু হবে – তখন করোনাভাইরাসের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ উপস্থিত হবে। তাকে তখন টিকা নেয়া মানুষকে সংক্রমণের জন্য নিজেকে (আবার) পরিবর্তন করতে হবে।

এখন, সত্যিই যদি টিকার কারণে ভাইরাসের নতুন বিবর্তন ঘটে যায় – তাহলে আমাদের হয়তো সেই টিকাকেও – কার্যকরী থাকার স্বার্থে – নিয়মিত আপডেট বা পরিবর্তন করতে হবে।

আমরা সাধারণ ফ্লু-র ক্ষেত্রে ঠিক তাই করছি।

আরও বিস্তারিত জানতে এখানে প্রশ্ন করুন

Subscribe
Notify of
guest
1 Comment
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
trackback
কোন COVID-19 ভ্যাকসিন থেকে আপনি কী পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া আশা করেন?
2 months ago

[…] […]